ভ্যাকসিন বিতরণে যে পদক্ষেপ নিতে হবে
DhakaReport24.com || 2020-11-14 21:22:15
কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বর্তমানে ৪০টির অধিক ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর্যায়ে আছে এবং ১৫০টিরও অধিক আছে বিকাশমান অবস্থায়। একমাত্র নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিনই পারে প্রাণঘাতী এ মহামারীকে রুখে দিতে। তবে এখানেই সব শেষ নয়, এরপর আছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—সংগ্রহ ও বিতরণ। ভ্যাকসিনের বিতরণের জন্য দেশগুলোকে অবশ্যই বিস্তৃত ও কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের টেকনোক্র্যাট হিসেবে মহামারীর বিরুদ্ধে আমরা কাজ করছি এশিয়া এবং আফ্রিকার নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে। আমাদের মতে, দেশগুলোকে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে নিজেদের জনগণ এবং অন্যদেরও রক্ষা করার জন্য। বৈশ্বিক এ মহামারী এরই মধ্যে আমাদের দেখিয়েছে, সবাইকে সুরক্ষিত না করে আমরা কেউই সুরক্ষিত থাকতে পারব না।
পাইলট প্রজেক্টকে বিবেচনায় নেয়া
সব দেশেরই শিশুদের জন্য ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রাম রয়েছে। কিন্তু সেগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দুষ্প্রাপ্য। ২০১৭ সালের মাঝে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলোর ১৯৪টির মাঝে কেবল ১১৪টিতে মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রাম চালু ছিল। উদাহরণস্বরূপ ভারতে বর্তমানে বয়স্কদের জন্য কেবল একটি ভ্যাকসিন প্রস্তাবিত আছে। সেটি হচ্ছে গর্ভবতী নারীদের জন্য টিটেনাসের ভ্যাকসিন। কিছু দেশ কেবল বয়স্ক লোকদের মতো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য মৌসুমি ফ্লুর ভ্যাকসিন দেয়ার পরামর্শ দেয়।
শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ভ্যাকসিন উপলব্ধ করার ক্ষেত্রে ডেলিভারি লজিস্টিক, সামাজিক প্রত্যাশা, সম্প্রদায়গত সম্পৃক্ততা, সরবরাহকারীদের মনোভাব এবং আরো অনেক ক্ষেত্রে পৃথক হয়। যখন কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন উপলব্ধ হবে, প্রায় ৪০ শতাংশ দেশ প্রথমবারের মতো এ পার্থক্যগুলোর মুখোমুখি হবে।
দেশগুলো চাইলে মৌসুমি ফ্লু ভ্যাকসিনেশন ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্কদের টিকা দেয়ার জন্য পাইলট প্রোগ্রামকে বিবেচনা করতে পারে, যা কিনা উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে সচরাচর অক্টোবর- নভেম্বরে এবং দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোতে এপ্রিল-মে মাসে দেয়া হয়। লকডাউন এবং অর্থনৈতিক সংকোচনের কারণে দেশগুলো নগদ অর্থের অভাবে রয়েছে, যা নতুন হস্তক্ষেপ নিয়ে আসাকেও কঠিন করে তুলেছে। কিন্তু ফ্লু ভ্যাকসিন পাইলট প্রকল্প ছোট অঞ্চলজুড়ে করা যেতে পারে, যা সেই দেশটিকে তার সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা, বিতরণ কার্যক্রম, পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়নকে পরীক্ষা করার অনুমতি দেয়। দাতারা এবং তহবিল সংস্থাগুলোর উচিত এটিকে কভিড-১৯-এর প্রতিক্রিয়া কৌশলের সহায়ক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা।
প্রি-কোয়ালিফিকেশন কাজে লাগানো
নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অনেকগুলো বাধার কারণে ভ্যাকসিনের জাতীয় নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বিলম্বিত হয়। প্রস্তুতকারীরা প্রথমে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে নিবন্ধনের ওপর মনোনিবেশ করে, যেখানে তারা বড় অংকের লাভ তুলে নিতে পারে। কোম্পানিগুলো বিবিধ নিয়ন্ত্রক চাহিদা ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে, বিশেষ করে উৎপাদক যদি অপরিচিত কিংবা কঠোর হয়।
নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে যুক্তরাষ্ট্রে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতো শক্তিশালী কর্তৃপক্ষগুলো দ্রুত পর্যালোচনা করার ক্ষেত্রে সম্পদের স্বল্পতা এবং দক্ষতার অভাবে ভোগে। সব মিলিয়ে এসব সমস্যার কারণে ভ্যাকসিনের রেজিস্ট্রেশন বিলম্বিত হতে পারে। ২০১৬ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাব-সাহারান আফ্রিকায় কোম্পানির প্রথম রেগুলেটরি সাবমিশন থেকে ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত অনুমোদনে সাধারণত চার থেকে সাত বছর পর্যন্ত লেগে যায়। এ সময়কাল কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনের জন্য অকল্পনীয়।
তাই এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রি-কোয়ালিফিকেশন প্রোগ্রামের ব্যবহার অধিক কার্যকর। এটি সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ভিত্তিক ভ্যাকসিন জোট গাভির মতো সংগঠন দ্বারা বিতরণের জন্য ভ্যাকসিনের সুরক্ষা, মান এবং কার্যকারিতাকে যাছাই করবে। ২০০১ সালে এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয়া এবং যক্ষ্মার ওষুধের প্রাপ্তি উন্নতকরণে এ প্রোগ্রামটি প্রয়োগ করা হয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে ইবোলা ভ্যাকসিনের দ্রুত প্রাপ্তির জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। ২০১৮ সালের মধ্যে কেবল ৩৬টি দেশ এবং সিএআরআইসিওএম (১৫টি ক্যারিবিয়ান জাতি) প্রি-কোয়ালিফিকেশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে। প্রত্যেকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, ভ্যাকসিনের জন্য নিজেদের স্ট্যান্ডার্ড রেগুলেটরি প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে, যা এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা মূল্যায়িত হয়েছিল। মধ্য আয়ের মুষ্টিমেয় দেশগুলোর মাঝে কেবল থাইল্যান্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরো অনেকের এটা বিবেচনা করা উচিত।
জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা
কভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের জন্য প্রত্যেক দেশের নিজস্ব প্রক্রিয়া তৈরি করতে হবে। বেশির ভাগ দেশের—১৭০টি দেশের এরই মধ্যে ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি প্রোগ্রাম (এনআইটিএজিএস) বা সেই মানের সংস্থা রয়েছে। যারা ভ্যাকসিন বাছাই, জনগণের নির্দিষ্ট অংশকে চিহ্নিতকরণ ও সরবরাহের ক্ষেত্র তৈরি করাসহ সংশ্লিষ্ট অন্য কাজগুলো করে থাকে। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও একটি স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইজরি গ্রুপ অব এক্সপার্ট (এসএজিই) রয়েছে, যারা সদস্য দেশগুলোকে কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন বিষয়ে পরামর্শ দেয়ার কাজ করছে।
এ গ্রুপ সাধারণত স্বাস্থ্য খাতের অভিজ্ঞদের দ্বারা গঠিত। তবুও যেহেতু কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার বিষয়টি স্বাস্থ্যের মতো জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক মূল্যবোধেরও ব্যাপার, তাই আমরা প্রস্তাব করব ‘এনআইটিএজি প্লাস’ টাস্কফোর্স প্রতিষ্ঠার জন্য। এতে অর্থ, শ্রম, বাণিজ্য ও শিল্প, সুরক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা থাকবেন। যার ফলে সব বিষয় সমান গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হবে।
দ্বিপক্ষীয় সমঝোতাকে নিরুৎসাহিত করা
ভ্যাকসিনে কেবল ধনীদের অংশগ্রহণ ঠেকাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও তার সহযোগী গাভি এবং দ্য কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশন ভ্যাকসিন বিতরণের একটি বৈশ্বিক কৌশল গ্রহণ করেছে। কোভ্যাক্স নামে সেই উদ্যোগটির লক্ষ্য হচ্ছে, আয়ের স্তর বিবেচনায় না নিয়েই অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশ যেন নিজেদের জনসংখ্যার ২০ শতাংশ ভ্যাকসিন লাভ করে। ১৭০টির বেশি দেশ এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৬৪টি ধনী দেশ এ সুবিধা ব্যবহার করে ভ্যাকসিন কেনার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
এর পরও অবশ্য অনিশ্চয়তা পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো দেশ এ উদ্যোগে যোগ দেয়নি, যা পরিস্থিতিকে সামনে জটিল করে তুলতে পারে।
সাফল্য পরিমাপ
কতজন মানুষকে টিকা দেয়া হয়েছে, তার বদলে প্রতিটি ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামকে বিচার করতে হবে মানুষের বেঁচে থাকা ও নিরাপদে কাজ করতে পারার ওপর ভিত্তি করে। এটি দেশে দেশে ভিন্নতর হবে। কারণ প্রতিটি দেশের পরিবেশ এবং সামাজিক ফ্যাক্টরগুলো ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ বেশির ভাগ দেশ তাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের সবার আগে ভ্যাকসিন প্রদান করবে। কিন্তু এরপর কারা ভ্যাকসিন পাবে তা নির্ভর করে নিজস্ব ডেমোগ্রাফিসহ আরো নানা বিষয়ের ওপর। তাই একটি দেশের সাফল্যের ওপর অন্য দেশের নির্ভর করা উচিত নয়। সবার উচিত সব ক্ষেত্রে নিজস্ব মানদণ্ড স্থাপন করা।
নেচার জার্নাল থেকে ভাষান্তর হাসনাত শোয়েব