কভিড-১৯ রুখতে বিজ্ঞানীদের পরামর্শ
DhakaReport24.com || 2020-10-12 21:48:15
প্রায় দশ মাস ধরে বিশ্বব্যাপী ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছে কভিড-১৯। এই মারণঘাতী রোগটিকে এড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ মানার কথা শুরু থেকেই বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে এর সংক্রমণের বিস্তৃতি থামাতে যা প্রয়োজন তা হলো মাস্ক পরা, ভিড় এড়িয়ে চলা এবং বারবার সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া। কিন্তু উত্তর গোলার্ধে আসন্ন শীতে এর সংক্রমণ আবারো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমরা খুঁজে দেখেছি সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কাকে হ্রাস করতে বিজ্ঞান সমর্থিত অতিরিক্ত কৌশলগুলো কী হতে পারে তা। এ লক্ষ্যে ‘দ্য সায়েন্টিস্ট’ কথা বলেছে ভাইরোলজি, ইমিউনোলজি ও মেডিসিনের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। যাদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে কোন বিধিগুলো তারা নিজেদের জন্য গ্রহণ করেছেন এবং অন্যদের প্রস্তাব করেছেন নভেল করোনাভাইরাস এবং অন্যান্য রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষিত থাকার জন্য।
কোনোটাই অবশ্য এখনো ক্লিনিক্যাল প্রমাণের দিক থেকে বৈশ্বিক মানদণ্ড স্পর্শ করেনি। তবে নিয়ন্ত্রিত কিছু ট্রায়ালে দেখিয়েছে তারা কভিড-১৯-এর সংক্রমণ কিংবা তীব্রতা কমাতে পারে।
ভ্যাকসিন নেয়া
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে একটি প্রমাণিত ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করে আছি। গবেষণা দেখিয়েছে যে বিদ্যমান কিছু ভ্যাকসিন, যেগুলো তৈরি হয়েছে জীবন্ত জীবাণুর দুর্বল সংস্করণ দ্বারা, সেগুলো জীবাণুর বিরুদ্ধে কিছুমাত্রায় সাময়িক সুরক্ষা দিতে পারে। এমনকি ভ্যাকসিনগুলোকে সে উদ্দেশ্যে তৈরি করা না হলেও।
উদাহরণস্বরূপ গত মাসে ‘সেল’-এ প্রকাশিত একটি ট্রায়ালের বিবরণীতে দেখা গেছে, যেসব বয়স্ক মানুষ যক্ষ্মার ভ্যাকসিন বিসিজি গ্রহণ করেছেন তারা অন্য রোগ থেকেও সুরক্ষা পেয়েছেন। বিশেষ করে এ ভ্যাকসিনকে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা দিতে দেখা গেছে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের বিরুদ্ধে।
এখন ট্রায়াল চলমান আছে এটা দেখার জন্য যে বিসিজি, ওরাল পোলিও এবং হাম, মাম্পস ও রুবেলার (এমএমআর) ভ্যাকসিন কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সুরক্ষা দেয় কিনা তা দেখার জন্য।
রবার্ট গালিও যিনি ম্যারিল্যান্ড স্কুল অব মেডিসিনের ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান ভাইরোলজির পরিচালক, যিনি ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখার কাজ করছেন। তিনি বলেন, এটি সাশ্রয়ী, গ্রহণ করা সহজ ও পাওয়াও সহজ। পাশাপাশি তিনি এও বলেন, অন্যান্য লাইভ ভ্যাকসিনও একইভাবে বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করতে পারে। যেখানে ইন্ট্রানাসাল ফ্লু ভ্যাকসিনও আছে। তিনি নিজে নেয়ার কথা বললেও বয়স অবশ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটি দেয়া হয় ২ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মানুষদের।
প্রচলিত ফ্লু শটগুলো লাইভ ভ্যাকসিন না। কিন্তু যেকোনো ফ্লু ভ্যাকসিন যা কিনা ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয় তা এ বছর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনার যদি ফ্লু হয় তবে আপনাকে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে, সেখান থেকেও আপনি কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হতে পারেন।
সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা
হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হওয়ার বাইরে ভিটামিন ডি শরীরের অনেক সিস্টেম ও কোষকে প্রভাবিত করে। যেখানে সহজাত ও অভিযোজিত ইমিউনিটিও আছে, বলেছেন নিউন্যাটোলজিস্ট কারোল ওয়াগনার। তিনি বলেন, আমি এবং আমার পরিবার ও বন্ধুবান্ধবরা অবশ্যই ভিটামিন ডি গ্রহণ করেছি। রোদের সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে এবং কিছু খাবার গ্রহণের মাধ্যমেও আপনি তা পেতে পারেন। এটি কভিড-১৯-এ সংক্রমিত হওয়ার কিংবা আক্রান্ত হলেও এর তীব্রতাকে হ্রাস করে।
একই সময়ে পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় রক্তে ভিটামিন ডি-এর উপস্থিতি এবং সার্স-কোভ-২-এ সংক্রমিত হওয়ার মাঝে বিপরীত সম্পর্কের কথা বলছে। যা গবেষকরা তাদের মডেলকে ডেমোগ্রাফিক ফ্যাক্টরের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরও স্থায়ী থাকে। তবে ভিটামিন ডি-এর অতিরিক্ত ডোজ বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে। তাই নিরাপদ মাত্রায় এটি গ্রহণ করা উচিত।
পরিবেশ আর্দ্র রাখা
ইমিওনোবায়োলজিস্ট আকিকো ইওয়াসাকি বলেন, শীতকালে ইনডোর ও আউটডোর উভয় জায়গায়ই রোদের স্পর্শ পাওয়ার সম্ভাবনা কমার সঙ্গে আর্দ্রতার মাত্রাও হ্রাস পেতে থাকে। গবেষণা বলছে শুষ্ক আবহাওয়ায় ভাইরাস অনেক দ্রুত চলাচল করতে পারে।
তার নিজের ল্যাবে তিনি এ বিষয়ের অন্য দিকটাও পরীক্ষা করে দেখেছেন। যেখানে তিনি বের করতে চেয়েছেন কীভাবে শুষ্ক বায়ু আক্রান্তের প্রতিরক্ষাকে প্রভাবিত করে কিনা। সেই পরীক্ষায় তিনি যা পেয়েছেন তা দুঃসংবাদই দিচ্ছে।
দেখা গেছে, শুষ্ক আবহাওয়া জলীয় স্তরকে পাতলা করে দেয়। যা ভাইরাল কণাকে বের করে দিতে পারে এমন সিলিয়ার চলাচলকে বাধা প্রদান করে। এর ফলে যা হয় তা হলো বায়ু চলাচলের পথে ভাইরাস কণা দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে। ফলে কোষের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি থাকে।
ইওয়াসাকি তার নিজের ঘরে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করেছেন আর্দ্রতার হারকে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশে রাখার জন্য। তিনি তার বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের লোকদেরও এটি করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, পুরো ঘরকে আর্দ্র করে রাখা গেলে খুব ভালো। যদিও তা খুবই ব্যয়বহুল। তবে আপনি যদি একটি ছোট হিউমিডিফায়ার শোবার ঘরে রাখেন, তবে সেটিই অনেকটা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
অ্যারোসলকে নিয়ন্ত্রণে রাখা
আরো একটি অভ্যাস যাকে দেখা যায় বায়ু চলাচলের পথকে শক্তিশালী করছে, যুক্ত করে শ্লেষ্মার স্তরকে যা জলীয় স্তরের নিচে জমা থাকে, যখন আমরা শ্বাস নিই। আমাদের শ্বাসনালি দিয়ে বায়ু ছুটে চলে এবং প্রধান শ্বাসনালিদ্বয় এ স্তরকে কিছুটা ভেঙে ফেলে। ফলে যখন আপনি শ্বাস নেন ওপরের বায়ুপথে আপনি অল্প ড্রপলেট উৎপাদন করেন, যা অনেক গভীরে যায় এবং আপনি যখন শ্বাস ছাড়েন তখন তা বেরিয়ে আসে, বলছিলেন বায়োইঞ্জিনিয়ার ডেভিড এডওয়ার্ডস। সেই ড্রপলেটগুলো ভাইরাসকে ফুসফুসে নিয়ে যেতে পারে কিংবা বাইরের পরিবেশে ছড়িয়ে দিতে পারে, যা অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
এডওয়ার্ড ও তার সহকর্মীরা দেখেছেন অ্যারোসল আকারের শ্বাসপ্রশ্বাসের ড্রপলেট ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন হয়। যাদের স্থূলতার সমস্যা আছে, যাদের বয়স বেশি এবং যারা কভিড-১৯-এ সংক্রমিত তারা নিঃশ্বাসে অনেক বেশি ড্রপলেট নির্গত করে।
অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, স্যালাইন সলিউশন, যেখানে ক্যালসিয়াম রয়েছে তা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করার ফলে একজন মানুষ যে অ্যারোসল নির্গত করে তার সংখ্যা হ্রাস পায়।
সব মিলিয়ে উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা হলে সামনের দিনগুলোয় করোনার সংক্রমণকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
দ্য সায়েন্টিস্ট থেকে সংক্ষেপে অনূদিত