সিরাজুল আলম খানের নাম বললেই ‘রহস্য পুরুষ’ হিসেবে তাকে সবাই চিনে। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি, তবে সবসময় নেপথ্যে কুশীলবের ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধপূর্ব এবং পরবর্তী রাজনীতিতে তিনি ছিলেন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে তেমন আলোচিত ছিলেন না। তবে বারবার তাকে ঘিরে শোনা গেছে নানা গুঞ্জন। বিশেষ করে দেশের রাজনৈতিক সংকটকালে তাকে ঘিরে ছড়িয়েছে গুজবের ডালপালা। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক শেষ পর্যন্ত নেপথ্যে থেকেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
‘দাদাভাই’ হিসেবে খ্যাত এই রাজনীতিক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন করেন। নিউক্লিয়াস ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামেও পরিচিত। এছাড়াও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গঠন এবং ‘৭ নভেম্বর ১৯৭৫’ এর নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতিতে সিরাজুল আলম ‘রহস্য পুরুষ’হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সিরাজুল আলম খানের জন্ম নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার আলীপুর গ্রামে। স্থানীয় স্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করে তিনি চলে যান বাবার কর্মস্থল খুলনায়। ১৯৫৬ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন। তারপর ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন। থাকতেন ফজলুল হক হলে। গণিতে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর ‘কনভোকেশন মুভমেন্টে’ অংশগ্রহণ করার কারণে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রতিদিন রাত করে হলে ফিরতেন। এই কারণে হল থেকেও একবার বহিষ্কৃত হন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করায় তার পক্ষে আর মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সিরাজুল আলম খান মেধাবী ছাত্র হিসেবে শিক্ষায়তনে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় স্কুলের ছাত্র থাকাকালে প্রথম মিছিলে যান। পরে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বিকশিত করে বাঙালিদের স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে যে নিউক্লিয়াস গড়ে ওঠে তিনিই ছিলেন সেটির মূল উদ্যোক্তা। তারপর মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ছয় দফার সমর্থনে জনমত গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
সিরাজুল আলম খানের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অঙ্কশাস্ত্রে হলেও দীর্ঘ জেলজীবনে তিনি দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা, রাজনীতি-বিজ্ঞান, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সমাজবিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান, সামরিক বিজ্ঞান, মহাকাশ বিজ্ঞান, সংগীত, খেলাধুলা সম্পর্কিত বিষয়ে ব্যাপক পড়াশোনা করেন। যার কারণে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ওপর গড়ে উঠে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ও দক্ষতা। সেই কারণে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন রাজ্যের অসকস বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৯৬-’৯৭ সনে। আর্থ-সামাজিক বিশেষণে সিরাজুল আলম খানের তাত্ত্বিক উদ্ভাবন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়। মার্কসীয় ‘দ্বন্দ্বমূলক বস্ত্তবাদ’- এর আলোকে বাংলাদেশের জনগণকে শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী হিসেবে বিভক্ত করে ‘রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক’ মডেল হাজির করেন সিরাজুল আলম খান। তিনি দেশে-বিদেশে ‘রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে পরিচিত। তার দীর্ঘ ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবন বেশ বর্ণিল।
‘দাদাভাই’ খ্যাত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক এবং রাজনীতির রহস্যপুরুষ শুক্রবার (৯ জুন) দুপুর ২টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় বৃহস্পতিবার রাতে তাকে লাইফ সাপোর্ট নেওয়া হয়। গত ৭ মে রাত সাড়ে ১০টায় শ্বাসকষ্টজনিত অসুস্থতার কারণে ঢাকার পান্থপথে শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয় সিরাজুল আলম খানকে। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ২০ মে ঢামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় তাকে। সিরাজুল আলম খান উচ্চ রক্তচাপসহ আরও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। রাজনীতির এই রহস্য পুরুষকে নোয়াখালীর নিজ বাড়িতে সমাহিত করা হবে।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/টিএএস/আরএএম