বাংলা ফন্ট

বাংলা সংস্কৃতি: চাই আর একটি ভাষা আন্দোলন

14-06-2018
যুবায়ের হাসান

 বাংলা সংস্কৃতি: চাই আর একটি ভাষা আন্দোলন পরের অংশ
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইংরেজির বাজারদর যতই বাড়ুক জাপান বা ইউরোপীয় দেশগুরি যে সেই কারণে তাদের ভাষার গুরুত্ব নিজেদের দেশে জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রগুলিতে কমিয়ে দিয়েছে এমন কোনও খবর কিন্তু এখনও নেই বরং সেখানকার মানুষ উচ্চ শিক্ষা থেকে জীবিকার সমস্ত ক্ষেত্রে সবার আগ্রহ ও সহযোগিতায় তাদের মাতৃভাষায় স্বাভাবিক ব্যবহার করতে পেরেছেন বলেই সেই সব দেশের অগ্রগতি ত্মরান্বিত হয়েছে। আমরা নিজের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি না ঘটিয়ে যদি শুধু ইংরেজি শিখে বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে আমেরিকার সমকক্ষ হতে চাই তাতে রং মেখে সঙ সাজাই হবে, লাভ কিছু হবে না। ময়ূর পুচ্ছধারী কাককে কোনও বুদ্ধিমান মানুষই ময়ূর বলে গণ্য করেন না।
(সূত্র: পাক্ষিক ‘দেশ’, ২ সেপ্টেম্বর ২০০৪, উত্তম কুমার রায়)
তা হলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ব্যাপারটা আদতে এই দাঁড়াল যে, আমাদের সংস্কৃতির শরীরের কোথাও কোথাও ভালমতো পচন ধরেছে- কোনো কোনো অংশ ইতিমধ্যে অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে। বিষয়টি খুবই গুরুতর; এখনই এই বর্ধনশীল রোগের সুচিকিৎসা না হলে, পুরো শরীরটি তিল তিল করে জরা জর্জরিত হয়ে একদিন মৃত্যুবরণ করবে। তখন আর হা-পিত্যেশ করেও লাভ হবে না।
মূল বাংলার জনমানষে আজ হতাশার দীর্ঘ বিস্তার, অন্যদিকে বাংলার বাইরে যে ছোট ছোট বাংলা- তাদের মরণ দশা। ঘরে-বাইরে কোথাও তাই স্বস্তি নেই। ঘরের দুয়ারে যে বাংলা তার ভালোমন্দ, বাঁচা-মরার বিষয়ে মূল বাংলা থেকেছে বরাবরের মতো উদাসীন, দায়িত্বহীন।
কোনো একটি গাছের মৃত্যুর আগে যেমন এর উপরিভাগ বা দূরবর্তী শাখা-প্রশাখা মরে যায়, তেমনই বাংলা সংস্কৃতির মূল কাঠামোর বহি:স্থ শাখা-প্রশাখাগুলো গত পাঁচ-ছয় দশকের মধ্যে প্রায় মরে গেছে বাঙালিরই দায়বদ্ধহীনতায়, অমার্জনীয় নিষ্ক্রিয়তায়। তার ফল হয়েছে এই যে, জরা-ব্যাধি আজ নেমে এসেছে মূল কাঠামোতে।
আসামে-আরাকানে কতো রক্তস্রোত বয়ে গেল- বাঙালি চোখ বন্ধ করে বসে থাকলো, যেন বা এগুলো তার সমস্যা নয়। তার চারপাশে লাখে-লাখে, কাতারে-কাতারে তারই জাত ভাই বাঙালিত্ব বিসর্জন দিতে বাধ্য হল- তাতেও সে নিশ্চুপ, নিরুত্তর। মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে আজো কেঁদে চলেছে পাহাড়ি বাংলা কাছাড়ের মাটি ও মানুষ, ঝাড়খন্ড আর আন্দামানে জেঁকে বসছে ‘রাজভাষা’র নাগপাশ- তার ভাবান্তর নেই। অবোধ্য অথচ ক্ষমাহীন এক নির্লিপ্ততায় কতো ক্ষতি যে এরই মধ্যে ঘটে গেল! নিজের মাকে অশ্রদ্ধা করে অন্যের মায়ের প্রতি গদগদ ভাব দেখাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজ পরিধেয় বস্ত্রটি খুলে যাওয়ার দশা- এর পর আর থাকে কী?
বহু শতাব্দীর গোলামির কারণে বাঙালির চরিত্রে এক ধরণের হীনম্মন্যতা দেখা দিয়েছে। পুরাতন প্রভু দেখলেই যেন আমাদের ‘লেজ’ নড়তে থাকে। ঠুসঠাস কিছু ইংরেজি বা হিন্দি শব্দ উচ্চারণ, যেকোনোভাবেই হোক অন্য সংস্কৃতির ক্ষতিকর দিকগুলোর অন্ধ অনুকরণ করাও তাই আমাদের মজ্জাগত রোগে পর্যবসিত হয়েছে।
কিন্তু সব কিছুর শেষ আছেÑ এই অধ:পতনেরও একটা সীমারেখা টানা দরকার এবং তা করতে হবে আমাদের চরম সর্বনাশটি ঘটে যাবার আগেই। পরে হা-হুতাশ করে কোনো লাভ হবে না।
কারা করবে, কীভাবে করবে- এসব জরুরী প্রশ্নের উত্তর একটাই, তা হল আমাদের নিজেদেরকেই যার যার অবস্থান থেকে এবং যৌথভাবে এ কাজ শুরু করতে হবে। এ নিবন্ধে, আজকের ‘বাঙালি’ বা ‘বাঙালি সমাজ’-কে উদ্ধার করে যে সব প্রসঙ্গের অবতারণা করা হয়েছে, তারা মূলত নগর নির্ভর সুপ্রতিষ্ঠিত, সুবিধাভোগী সমাজের লোক এবং তাদের একটি বড় অংশ অপ-শিক্ষিতও বটে। শ্রেণী চরিত্রের কারণে তারাই আমাদের বাঙালি সমাজের অভিভাবক সেজে বসে আছে। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, বৃহত্তর সমাজের অন্তত: পঁচানব্বই ভাগ মানুষ বরাবরের মতো এই শক্তি বলয়ের বাইরে থেকে গেছেÑ এরা একান্তই সাধারণ মানুষ। প্রতিটি জাতির আশা-ভরসার স্থল হিসাবে শেষ অবধি এই সাধারণ মানুষেরাই ভূমিকা রাখে। সামাজিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তনের সুযোগ না পেলেও, এরাই সংস্কৃতির মূল স্রোতধারা হিসেবে বিবেচিত ও পরিগণিত হয়। শিকড়ের টানেই হোক বা ঐতিহ্যপ্রীতির কারণেই হোক, নগরকেন্দ্রিক শক্তি বলয়ের একটি অংশের মধ্যেও মূল ধারাকে অনুসরণ করার ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা থেকে যায়। সময়ান্তরে তাই এক আধটি গণমুখী কর্মসূচী বা সিদ্ধান্ত আমরা প্রত্যক্ষ করি।
দু’বাংলায়, বিশেষত: পশ্চিম বাংলায় বাংলা ভাষার দৈন্যদশা ঘুচাতে প্রথম কাজ হবে অন্য যে কোনো ভাষা-মাধ্যমের বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শিক্ষা পাঠক্রম বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা। ভারতের প্রায় সকল রাজ্যেই, বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থানীয় ভাষাকে এ জাতীয় মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রাথমিক স্তর থেকেই এ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন- মাধ্যমিক স্তর থেকে নয়, কেন না, শৈশবকালে একজন মানুষ যে পরিমাণ জ্ঞান আহরণ বা ধারণ করতে পারে, জীবনের অন্য কোনো পর্যায়েই তা পারে না। বাংলাদেশের ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে অধুনা প্রাথমিক স্তর থেকেই বাংলা ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা প্রচলনের পাশাপাশি পশ্চিম বাংলার প্রশাসনিক কার্যাদিতে বাংলাকে আবশ্যকীয় ভাষা ঘোষণা করে শুধুমাত্র ইংরেজিকে বিকল্প ভাষার মর্যাদাদানের মাধ্যমে প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।
মুম্বাইজাত জীবন-বিবর্জিত সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের তরুণ সমাজ নিজ সংস্কৃতিকে উপেক্ষা-অবহেলা করতে কার্পণ্য বোধ করছে না; কপট, ভ্রান্ত মৃত্তিকাছিন্ন মনমানসিকতায় পুষ্ট হচ্ছে। এদেরকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা খুব সহজ কাজ নয়। বিনোদন দিয়েই বিনোদনের মোকাবেলা করতে হবে। ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’ কিংবা ‘বিষে বিষ ক্ষয়’ জাতীয় বাংলা প্রবচনগুলো আজো সমান অর্থবাহী। আমরা যেন ভুলে না যাই, দলবদ্ধতায় জয়, বিভাজনে পরাজয়। রাজনৈতিক বা ভৌগলিক পরিচয় যায় হোক না কেন, নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার স্বার্থে দু’বাংলার আন্ত:সম্পর্ক গভীর ও নিবিড় করে তুলতে হবে। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, অন্যের নিকট অবাধ ও উন্মুক্ত করে দিতে হবে। একজনের লোকপ্রিয় সাংস্কৃতিক উপাদান অন্যজনকেও অনুপ্রাণিত করতে পারে। একজনের কমতি অন্যজন পূরণ করতে পারে, অর্থাৎ একজন আরেক জনের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করার সামর্থ্য রাখে। আন্ত:যোগাযোগ, ভালবাসা-বিনিময় সব সময়ই উভমুখী হতে হয়। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগেও বাংলাদেশের আকাশ-নির্ভর সম্প্রচার মিডিয়াগুলো সারা পশ্চিম বাংলায় প্রদর্শন অযোগ্য করে রাখা হয়েছে, বন্ধ আছে বই-পত্র, প্রকাশনা সাময়িকীর আমদানিও। পশ্চিম ভারতের পুঁজির সংরক্ষণ আর উত্তর ভারতের সামাজিক কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ রাখার কাজে নিয়োজিত মুষ্টিমেয় তল্পিবাহকরাই যে কৌশলে এসব কূটকাজ করাচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ সব অলিখিত ‘কালা কানুন’ যত তাড়াতাড়ি প্রত্যাহার হয়, ততই মঙ্গল।
একটা কথা সবারই মনে রাখা দরকার, আজ যদি প্রাণ সঞ্চারী পথ্যের অভাবে কলকাতার সংস্কৃতিগত মৃত্যু হয়, তবে আগামীকাল ঢাকাও হুমকির মধ্যে পড়বে।
আজ যারা ভাষা শহীদ স্মারক সমিতি বা ভাষা চেতনা সমিতির নামে সাইনবোর্ড বাংলায় লেখার দাবিতে সোচ্চার, কাল হয় তো বৃহত্তর দাবিতে তারাই হয়ে উঠবে মহীরুহ-দুর্দমনীয় এক শক্তি। বাঙালির জীবনে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ভাষা বিপ্লবটি আসবে হয় তো এদেরই হাত ধরে। বিপন্ন এই সংস্কৃতির আঁধার দূর করতে অবশ্যই চাই একটা ভাষা আন্দোলন। একটা সংহত, সংগঠিত আন্দোলনই শুধু পারে পুরো পরিস্থিতি বদল করে দিতে। আজকের প্রেক্ষাপটে বাঙালির এ লড়াই খুব সহজ হবে না; বাইরের শত্রুর চোখ রাঙানির পাশাপাশি আজ ঘরের শত্রু বিভীষণও বর্তমান।
আত্মস্বার্থে বা আক্রমণের ভয়ে আজ যদি আমরা আমাদের ভাষা ত্যাগ করি, তবে আগামীকাল নিশ্চিতভাবেই আমাদের ঘরও ছেড়ে যেতে হবে। অহিংস, নিরীহ গোছের আন্দোলনে পৃথিবীর কোথাও কখনো কার্যকর ফল লাভ সম্ভব হয়নি, কেননা স্বভাবগতভাবে নিবীর্য এই আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার কোন সামর্থ্য থাকে না। সত্যিকারের একটা আন্দোলন সব সময়ই রক্ত দাবি করে। আর আমাদের সামনে জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে আছে একুশে ফেব্রুয়ারি আর উনিশে মে।

সর্বশেষ সংবাদ