বাংলা ফন্ট

‘নৃ’ চলচ্চিত্র নিয়ে রাসেল আহমেদ এর সাথে কথপোকথন

18-05-2017

‘নৃ’ চলচ্চিত্র নিয়ে রাসেল আহমেদ এর সাথে  কথপোকথন
(কয়েকদিন ‍আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ‘নৃ’ চলচ্চিত্রের নির্মাতা রাসেল আহমেদ মারা যান। রাসেল ‍আহমেদ চার বছর ধরে শুটিং নিয়ে যুদ্ধ করছিলেন। ভিটেবাড়ি বিক্রি করেছেন সিনেমার জন্য। ধারদেনা করেছেন। পাওনাদারদের চাপ ছিল। চলচ্চিত্র ‘নৃ’র মুক্তি দিয়ে যেতে পারলেন না। তিনি শুধু একজন নির্মাতা ছিলেন না, তৃতীয় বিশ্বের একজন সাহসী সৎ নির্মাতা ছিলেন তিনি। যাঁর বুক ভরা ছিল এ দেশ আর এ দেশের চলচ্চিত্রকে নিয়ে ভাবনা। এক কাপ চায়ের টাকাও তিনি বাঁচিয়ে রাখতেন চলচ্চিত্রের জন্য। বরিশালের মাটিতে চির নিদ্রায় শায়িত এই নির্মাতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম-এ ‍আজ তার ‍একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হল।সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন নাজমুল হাসান মজুমদার।)
প্রশ্ন: কেমন আছেন? নৃ আপনার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ?

 –দূর্দান্ত আছি। নৃ চলচ্চিত্রটি আমার পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এর আগে কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছি। এক খন্ডের টেলিভিশন নাটকও রয়েছে ঝুড়িতে। যদিও স্বল্পতা আর পূর্ণতার সংজ্ঞা আপনি সময়ে বেঁধে প্রকাশ করতে পারেন, এটা আমি বিশ্বাস করি না।

প্রশ্ন: চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে নিজেকে জড়ালেন কিভাবে ? কবে ,কখন মনে হল চলচ্চিত্র আপনার জন্য ?

–আঁকাআঁকি, লেখালেখি, মিউজিকাল গ্রুপ, পত্রিকা, লিটল ম্যাগ, সংগঠন, ভাবনা, চেতনা, বোধ ও দায়বোধ উপলব্ধিই এক সময় আমাকে প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রকে বেছে নিতে সাহায্য করেছিল। শুভাকাঙ্খী ও বন্ধুরা প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়েই আমার উন্নয়নে আশাবাদী ছিল। কিন্তু তাঁদের আশায় ছাই দিয়ে একের পর এক বিষয়বস্তু পাল্টে কাজ করছিলাম। নিজেও জানতাম না কেন এভাবে করছি। এক সময় প্রযুক্তির কল্যাণে কম্পিউটারের জাদুকরী ক্ষমতা এবং ভিডিওগ্রাফির চমকপ্রদ বিষয়াদি আমাকে চলচ্চিত্র ধারনার সঙ্গে পরিচিত করে। এসব নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়েই আমি সব বিষয়ের কেন্দ্রীভূত হবার জায়গাটা খুঁজে পাই। আর সেটা হল চলচ্চিত্র।

প্রশ্ন: কাকে চলচ্চিত্র জগতে আপনার আদর্শ মনে করেন ?
 
–চলচ্চিত্রের ভাষা ও নন্দনতত্বে শিক্ষিত হয়ে ওঠার জন্য পৃথিবীব্যপী অনেকগুলো মানুষই আমার কাছে আদর্শ মনে হয়। তবে আমাদের, বিশেষ করে এশিয়ানদের চলচ্চিত্র ভাষা বুনন ও নির্মাণে সত্যজিৎ রায়কে আমার একজন আদর্শ শিক্ষক মনে হয়।

প্রশ্ন: কবে থেকে নৃ-র কাজ শুরু হয়েছে ?

–নৃ চলচ্চিত্রটির প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন। বরিশাল মহাশ্মশাণের দুই চন্ডাল- দিলীপ কুমার পাল ও রাধা বল্লভ শীল এর সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় নয় বছরের। ওদের জীবনবোধ ও নিজস্ব দর্শন আমাকে একটু একটু করে মুগ্ধ করেছে। এটাই এক সময় চলচ্চিত্র ভাবনায় রূপ নেয়। হিসেব করে বলতে গেলে, গত বছর মানে ২০১২ সালে আমি এই ভাবনাকে দৃশ্যায়নে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেই। সেই মোতাবেক গত বছরের জুন-জুলাই নাগাদ চলচ্চিত্রটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করি। শ্যুটিং শুরু হয় ২০১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী। এখনও ছবিটির কাজ চলছে।চলচ্চিত্রটির পুরো গল্প দৃশ্যায়ন হচ্ছে বরিশালে।

প্রশ্ন:নৃ কি বানিজ্যিক চলচ্চিত্র?

–নৃ অবশ্যই বানিজ্যিক সিনেমা। তাই বলে গতানুগতিক বানিজ্যিক সিনেমার সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হবে। সম্পূর্ণ শুদ্ধ শিল্পমান নিয়েই নৃ বানিজ্য করবে আমার বিশ্বাস। এই বানিজ্য মান যদিও আমরা অনেক দিন হল হারিয়ে বসে আছি।

প্রশ্ন: চলচ্চিত্রটির গল্প ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু বলুন।

–এই চলচ্চিত্রের গল্পের কাহিনী খুবই সরল। এক সম্ভ্রান্ত ক্ষয়িষ্ণু হিন্দু পরিবারের প্রধান, তথাকথিত ভ্যাগাবন্ড হওয়ার কারণে মা বিহীন দুই ছোট ছোট ভাই-বোনের জীবনে নেমে আসা ক্রাইসিস নিয়ে গল্পটা রচিত। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দূর্গাসাগর নামক এক বহু পুরনো দীঘির মিথ। সমাজের নিচু শ্রেণী হিসেবে পরিচিত দুই চন্ডালের ভূমিকা। রোজার শুরুতে যে গল্পের শুরু, ঈদের দিন সন্ধ্যায় সেই গল্পের শেষ। কিন্তু কথা হচ্ছে, চলচ্চিত্র চলমান। চলচ্চিত্র কখনই শেষ হয় না। গল্পের সরল বিন্যাসের আড়ালে স্তরে স্তরে উপস্থিত সমাজ ও ধর্মের নানা খুঁটিনাটি। সময়ের স্রোত ধরে যা যুগে যুগেই বহমান। মূলত এর মধ্য দিয়েই সার্বজনীন মানববোধের গল্প নিয়ে নির্মান হচ্ছে চলচ্চিত্র নৃ। নৃ সম্পূর্ণ আমার নিজের রচিত কাহিনী।

প্রশ্ন: কোন ক্যামেরায় এবং কোন ফরমেটে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হচ্ছে ?

–ডিএসএলআর ক্যামেরায় আর ডিজিটাল ফরম্যাটে নির্মিত হচ্ছে চলচ্চিত্রটি। একটি ক্যানন ফাইভ ডি মার্ক থ্রি এবং দুইটি ক্যানন সেভেন ডি ক্যামেরা, মোট তিন ক্যামেরায় চিত্রায়ন হয়েছে নৃ এর।

প্রশ্ন: শুনেছি চলচ্চিত্রটিতে যারা অভিনয় করেছেন তাদের সবাই নতুন শিল্পী ?

–বাজারীদের হিসেব অনুযায়ী ঝুঁকি থাকলেও, নৃ চলচ্চিত্রে তথাকথিত কোন স্টার কাস্ট নেই। এখানে যারা অভিনয় করছেন তারা সকলেই নতুন। মূল চরিত্র বিধু ও বিশুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাসনোভা তামান্না ও মোহাম্মদ ইয়াসীন। বরিশাল মহাশ্মশাণের দুই চন্ডাল দিলীপ কুমার পাল এবং রাধা বল্লভ শীল অভিনয় করেছেন তাদের স্ব স্ব চরিত্রে। এছাড়াও রয়েছেন সিরাজুম মুনীর টিটু, ফারহানা আখতার সীমা, দুখু সুমন, হ্যাভেন খান, আদর, আলো, আভা প্রমুখ।

প্রশ্ন: চলচ্চিত্রটির সংগীতায়োজনের ব্যাপারে আপনি কিছু বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছেন বলে জেনেছি। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।

– চলচ্চিত্রটির সংগীতায়োজন একটা চমক হিসেবে আমি রাখতে চাই। অবশ্যই নিজস্ব পরিকল্পনা ও স্বকীয় ডিজাইন রয়েছে আমাদের। তবে এ বিষয়ে এটুকু বলার আছে- দৃশ্য বিন্যস্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রটির সাউন্ড স্কোর যেন একটি আলাদা সম্পূর্ণ গল্প নিয়ে দাঁড়াতে পারে, সেরকমই একটি ডিজাইন আমরা করছি।

প্রশ্ন: চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে গিয়ে কি কোন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন?

–প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়নি, এমন কোন চলচ্চিত্র পৃথিবীতে তৈরি হয়েছে কি না আমার সন্দেহ আছে। তবে প্রতিবন্ধকতা যেমন থাকে, তেমনি থাকে সহযোগিতা/সহমর্মিতা। আমরাও প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হয়েছি প্রতি পদে। ঠিক তেমনি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাতও পেয়েছি প্রচুর। যার কারনে “নৃ” এখনও চলমান।

প্রশ্ন: একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আপনি কোন বিষয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন ? কাহিনী,চিত্রনাট্য,ক্যামেরা,সিনেমার লোকেশন নাকি অন্যকোন বিষয়ে ?

–চলচ্চিত্র একটি সম্পূর্ণ কম্পোজিট মাধ্যম। এখানে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমের মিলন ঘটে। শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, নাট্য সহ অনেকগুলো মাধ্যম এখানে যুক্ত হয়। তবে সবকিছুর পেছনে ভালো একটি গল্পের প্লট মূল উপাত্ত হিসেবে কাজ করে।

প্রশ্ন: ছবিটি কারা প্রযোজনা করছেন?

–সিনেমাটি আমার নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘থিম থিয়েটার উইজার্ড ভ্যালী‘ থেকে প্রযোজিত হচ্ছে।

প্রশ্ন: কবে নাগাদ ছবিটি মুক্তি দেয়ার ইচ্ছে রয়েছে ? কোন আন্তর্জাতিক উৎসবে কি ছবিটি নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আছে?

–পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু আমাদের অনুকূলে থাকলে ২০১৪ সালেই আমরা চলচ্চিত্রটির আনুষ্ঠানিক মুক্তি আশা করছি। আমরা নিজস্ব ভাষা বুননে নৃ-কে আন্তর্জাতিক রূপ দেয়ায় সচেষ্ট রয়েছি। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎসবে আমরা অংশ নিতেই পারি। তবে একটা কথা, আমরা কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য নৃ তৈরি হচ্ছে না।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা কী? দশ বছর পর বাংলা চলচ্চিত্র এবং নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান?

–বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে অবশ্যই আমার স্বপ্নের কোন সীমা-পরিসীমা নেই। নিজস্ব শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্বতায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে; অনেকের মত এমন স্বপ্ন আমিও দেখি। আর সেই লক্ষ্যেই প্রতিনিয়ত প্রতিবন্ধকতা ঠেলে কাজ করে যাচ্ছি। কাজ, কাজ আর কাজ; চলচ্চিত্রের তরে আমি শুধু কাজ করে যেতে চাই। যদি বলি, এই কাজের মাঝে থাকাটাই আমার সব থেকে বড় স্বপ্নপূরণ, সেটা ভুল হবে না।

প্রশ্ন: কারিগরি দিক দিয়ে দেশীয় চলচ্চিত্র কেমন এগুচ্ছে ? চলচ্চিত্রের হল সঙ্কট এই শিল্পকে কেমন বাধাগ্রস্ত করছে ? এ ব্যাপারে কি ধরণের সহযোগিতা আপনি আশা করেন ? দর্শকে হলমুখী করতে সরকার কিংবা হল মালিক কিংবা প্রযোজকরা কি ব্যবস্থা নিলে ভালো হবে ?

–কারিগরি দিক দিয়ে আমি বলবো, নির্মাতাদের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে না এ দেশীয় চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট কারিগরি মাধ্যমগুলো। বিশেষ করে লাইটস্ ও সাউন্ডে আমাদের শিক্ষা ও আউটপুট দূর্বলতার কথা না বললেই নয়। আর হল সঙ্কট আসলে তৈরি হয়েছে। এটা ছিল না। দর্শককে হলমুখী করার জন্য আমি অন্য কারো কথা না বলে, একজন নির্মাতা হিসেবে আমি নির্মাতাদের দূর্বলতাকেই ইঙ্গিত করবো। আমরা ভালো কিছু বানাতে সক্ষম হচ্ছি না, তাই এই নিম্নগতি। অন্যদের দোষারোপ না করে আমি তাই আমাকেই দোষারোপ করছি।

প্রশ্ন: আপনার ছবির প্রচারণা নিয়ে কি ভাবছেন ? কিভাবে করবেন ?

–প্রচার ও প্রকাশনা নিয়ে অবশ্যই আমাদের বর্তমান সময়কে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে কিছু নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে। সার্বজনীন বিন্যাসে সৃষ্ট এই চলচ্চিত্রকে সর্বসাধারনের কাছে পৌঁছে দিতে আমাদের রয়েছে নতুন আইডিয়া। যা সময় হলেই দেখতে পাবেন।

প্রশ্ন: সর্বশেষ প্রশ্ন ,আপনি চলচ্চিত্রকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন ? আপনি কি পেশা হিসেবে চলচ্চিত্রকে নিবেন ? নাকি পাশাপাশি অন্য কোন পেশাতেও জড়িত থাকার ইচ্ছে আছে ?

–সবকিছুই চলচ্চিত্রময়। আমি আসলে এভাবেই দেখি সবকিছুকে। অন্যকিছু ভাবার অবকাশ আমার নেই।


সর্বশেষ সংবাদ