বাংলা ফন্ট

সদ্য প্রয়াত কবি ফল্গু বসুর কয়েকটি কবিতা

25-04-2017

সদ্য প্রয়াত কবি ফল্গু বসুর কয়েকটি কবিতা


(ফল্গু বসু পশ্চিম বাংলার একজন মেধাবী কবি। একদা মানুষের মুক্তি আন্দোলনে নিজেকে শামিল করতে জড়িয়ে পড়েছিলেন চারু মজুমদারের লাইনে। সাথে সাথে বীজ বুনেছিলেন কবিতারও। সে পথ ধরে এখন খানিক দূরে পৌঁছে গেছেন তিনি। যদিও আড়ালে আছেন অনেক পাঠকের। কেননা, কলকতা কেন্দ্রিক নন তিনি, এটাও হয়তো একটা ব্যাখ্যা হতে পারে; অথবা তা নয়। কারণ কবি শেষ পর্যন্ত আলোয় বেরিয়ে আসেন সামনে।  কয়েকদিন ‍আগে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী রেখে তার কয়েকটি কবিতা প্রকাশ করা হল।)

ধৃষ্ট পা

প্রথমে ম্লান এই আকাশ দেখেছিলে দু চোখে বিস্তর জিজ্ঞাসায়
শোনো নি কোনও গান শীতের অনুভূতি দেখোনি আলোদের উৎসাহ
কেমন জ্বলে উঠে অচিরে নিভে যায় আসলে আর ওদের স্বাস্থ্য নেই।
সকলে খুলে নেয় হীরকঅঙ্গুরী রাতের রক্তিম চন্দ্রিমাও
দেখে না কারো মুখ কোমল বাহুলতা কেমন জড়িয়েছে শূন্য হাত
পৃথিবী জ্বালানোর এখনো দেরী আছে ভিতরে সুগভীর তমিস্রায়
অন্ধ হয়ে আছি আমরা সকলেই বাইরে তৃণহীন দিগ্বলয়
শুনবে মাঝরাতে বৃষ্টি থেমে গেছে থেমেছে সঙ্গীর ধৃষ্ট পা

টিকটিকি

টিকটিকি আমার ভাই কিন্তু স্বভাবে অনেক চাপা
ভালো মানুষের চেয়ে ভালো ওৎ পেতে বসে আছে
কারো সাথে কথাই বলে না।আমি কথা বলি খুব
পাহাড় বোঝাতে গিয়ে আশ্রয় বুঝিয়ে বসে থাকি
তথাপি মুখের মিল দেখে অনেকেই ধরে নেয়
টিকটিকি আমার ছেলে অথবা নিজের ছোট ভাই
কাচের ভেতরে থাকা যে কোনও পদার্থ স্বল্পাধিক
বড় মনে হতে পারে যদি তা ভিজিয়ে রাখা হয়।
মরা কোলে ঘাটে গেলে মাংস ফুল জল মুদ্রা নীল
পাঁচ মাসে কে এসেছে অতিরিক্ত হাসি মাখা ঠোঁটে ?
অসমর্থ পা দুটোকে তুমি ঝুলিয়ে রেখো না পুত্র
আরও সরু হয়ে যাবে ,বন্ধুদের ঘরে বসতে বলো
আজকেও ছুটি নিয়ে বাড়ি থাকব তোমাদের সাথে।

আরশোলা

ঘণ্টা নাড়ো জোরে জোরে ঘণ্টাটি বাজাও
আমি ক্ষুদে পোকা খেয়েছি ঘুমের বড়ি
পল্লীর প্রবেশমুখে আন্দাজে এসেই
গ্রামটিকে বন্ধুদের গুহা মনে হয়
অণ্বেষণ শব্দটিকে প্রাণপণে খুঁজি
প্রাপ্তিযোগ যুগে যুগে উচ্চাশায় ভোগে
অন্ধকার থেকে আমাকে উদ্ধার করো
উচ্চাশার মায়াজালে আমি চতুর্ভূজ
ধরাধামে এসে ঝামেলায় পড়ে গেছি
মালের গুদামে থাকি গুরটুর খাই
তেলের পিপের পাশে নিজের চেহারা
অনুমান করি মাত্র আনন্দে পুলকে
নিমেষে ঘণ্টার সঙ্গে বৃথা তর্কে মেতে
কত দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে মনুষ্য সমাজ
হায় রে নদীর গতি অন্যদিকে চোখ
ঘুমঘোরে হেঁটে যাওয়া মানুষকে আমি
সুরসুরি ছাড়া কিছু দিতেই পারিনি।


গিরগিটি

ইচ্ছে ছিল ঘুরে ঘুরে দেখব যুগের হাল প্রত্যেকের খুঁটিনাটি দেখে
দোষ ও গুণের কথা সবিস্তারে লিখে যাব যাতে অনেকে অন্যের সাথে
কিছু মিল খুঁজে পায়। নিজে সে অভ্যাসমত লক্ষ্যের আওতায় পড়ে না
বহুরূপে সন্মুখে থেকেও নিজেই অদৃশ্য থেকে যায়। নিজেকে চেনার
অনেক উপায় আমি মনে মনে ঠিক করে অতঃপর পথে বেরিয়েছি
অন্তর্যামী গিরগিটি আমার মনের ভাব জানে বলে মনে হলো..তবু
তাকে আমি জিজ্ঞেস করিনি দ্রুত সমবেত সকলেই সহমর্মী কিনা
নৈতিক শিক্ষাকে তারা কতখানি গ্রহণ করেছে তাও শুধোইনি তাকে
আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখেছি গিরগিটির বিজ্ঞান কেমন নির্ভুল হয়
সে উদ্বাস্তু কলোনীতে ভাষণ দেবার আগে দুদিন আছাড় খেয়েছিল
ফলে সেই ভাষণের প্রতিটি অক্ষর থেকে সেও আর আলাদা থাকেনি
অভিজ্ঞতা দোষে ক্র্রমে আমিও জনৈক সেজে যুগের মিছিলে মিশে যাই
গিরগিটির মতই শত্রুকে মিত্র বানিয়ে এগোই স্ট্রাগল করে করে ...

সর্বশেষ সংবাদ