বাংলা ফন্ট

বনানীর 'গুণধর' ওসি ফরমানের যত কীর্তি

15-05-2017
নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম

বনানীর 'গুণধর' ওসি ফরমানের যত কীর্তি
ঢাকা: রাজধানীর বনানী থানার ওসি বিএম ফরমান আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। নিরপরাধ লোকজনকে ধরে টাকার জন্য হয়রানি, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে আসামিদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে বেশুমার। সাধারণ মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করাও তার কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। পুলিশের একজন পরিদর্শক হয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে ঢাকার একটি অভিজাত ক্লাবের ডোনার সদস্য হওয়ার ঘটনাতেও বিস্মিত তার সহকর্মীরা। সর্বশেষ বনানীর হোটেলে দুই ছাত্রীকে আটকে রেখে ধর্ষণের ঘটনায় প্রভাবশালী ধর্ষকদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঘটনার শিকার দুই ছাত্রীকে আইনি সহায়তা না দিয়ে উল্টো গালাগাল করে থানা থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। 'গুণধর' এই ওসিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে পুলিশ বিভাগেও চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। এর পরও তিনি বহাল তবিয়তে।

দুই ছাত্রী ধর্ষণ মামলার প্রভাবশালী আসামিদের গ্রেফতার না করে ছুটিতে চলে গিয়েছিলেন ওসি ফরমান আলী। বিভিন্ন মহল থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠলেও গত শুক্রবার তিনি থানায় যোগদান করেন।

পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, ওসি ফরমান আলী পুলিশ বিভাগে খুবই প্রভাবশালী। তার নানা অপকর্মের বিষয়ে পুলিশের ঊধ্বর্তন মহল অবগত। তবে মাথার

ওপর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশীর্বাদ থাকায় কখনোই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এমনকি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাকে 'সমীহ' করে চলেন বলে কথা চালু রয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ফরমান আলী বলেন, তিনি সব সময় আইনের মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। বনানীর হোটেলে ধর্ষণের শিকার দুই ছাত্রী তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তুলছেন তা মিথ্যা।

ওসি ফরমান আলীর ঘুষবাণিজ্য :সূত্র বলছে, ওসি ফরমান আলীর ঘুষ কেলেঙ্কারি নতুন নয়। গত ২১ ফেব্রুয়ারি আনোয়ার নামের এক ব্যক্তিকে আটকের পর ঘুষবাণিজ্যের ফাঁদ পাতেন তিনি। ওইদিন রাত সাড়ে ১২টায় বনানী ঢাকা গেটের সামনে থেকে আনোয়ারকে তার প্রাইভেটকারসহ আটক করেন বনানী থানার এসআই সাইফুল ইসলাম। তবে তার বিরুদ্ধে মামলা না দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন ওসি। তা না হলে ওই ব্যক্তিকে ইয়াবা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। ৩ লাখ টাকা দাবি করা হলেও শেষ পর্যন্ত এক লাখ টাকায় ছাড়া পান আনোয়ার। ওই সময় ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও ফরমানের কিছুই হয়নি।

ওই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ফরমান আলী বলেন, তিনি কোনো ঘুষের ঘটনায় জড়িত নন। টাকার বিনিময়ে কোনো আসামিকে থানা থেকে ছাড়ার নিয়ম নেই। তিনি তা করেনও না।

স্বামী ছাড়া ধর্ষণ মামলা নেন না :গত মার্চের শুরুর দিকে মহাখালী এলাকায় এক তরুণী পোশাক শ্রমিক কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কড়াইল বস্তির পাশে স্থানীয় চার যুবক তাকে তুলে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। ওই তরুণী ঢাকা মেডিকেল কলেজের ওসিসিতে (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) ৮ দিন চিকিৎসার পর গত ১২ মার্চ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। ওসিসির নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি বনানী থানায় মামলা করতে যান। তিন দিন তাকে ঘোরানো হয়। তিন দিন পর মেয়েটি ওসি ফরমান আলীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। তবে মামলা না নিয়ে সেটি তিনি ছিঁড়ে ফেলেন।

ওই তরুণীকে ওসি বলতে থাকেন, এটি ফালতু অভিযোগ। স্বামী ছাড়া কোনো মামলা নেওয়া হবে না। এর পর ওই তরুণী আদালতে ধর্ষণের মামলা করেন।

অভিযোগের বিষয়ে ফরমান আলী বলেন, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন তিনি সে চেষ্টা করেছিলেন। ওই তরুণী যেসব অভিযোগ করেছেন তা ঠিক নয়। ফরমান আলী এই প্রতিবেদককেই ঘটনাটি তদন্ত করে দেখতে বলেন।

৭০ লাখ টাকায় উত্তরা ক্লাবের সদস্য : ওসি ফরমান আলী অর্ধকোটি টাকা খরচ করে সদস্যপদ নিয়েছেন অভিজাত উত্তরা ক্লাবের। এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে পুলিশ বিভাগেও। তবে প্রভাবশালী ফরমানের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি কেউ।

সূত্র জানায়, ক্লাবটির তিন ক্যাটাগরির সদস্যপদের মধ্যে দাতা সদস্যপদ নিয়েছেন ওসি ফরমান। দাতা সদস্য বা ডোনার ক্যাটাগরির পদ নিতে কমপক্ষে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়। চাকরিরত একজন ওসি কী করে এ বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সদস্য হলেন তা নিয়ে ক্লাবটির সদস্যদের মধ্যেও রয়েছে আলোচনা। ফরমান আলীর মেম্বারশিপ নম্বর ডিএম ৩৯৫।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, একজন ওসির মাসিক বেতন সাকল্যে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এমন অভিজাত ক্লাবের সদস্য হতে তিনি এত টাকা পেলেন কোথায়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের কিছু বিধিমালা থাকে। ওসি ফরমান আলী বেসরকারি ক্লাবের সদস্য হয়ে সে বিধিমালাও ভঙ্গ করেছেন।

ওসি ফরমান আলী বলেন, উত্তরা ক্লাবের সদস্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠায় তিনি বিস্মিত। সদস্য হতে এত টাকা পেলেন কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এখানে টাকার প্রশ্ন আসে কেন? সদস্য হতে টাকা লাগার বিষয়টি আমার জানা নেই।'

আরও যত অভিযোগ :সূত্র জানায়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নির্যাতিত পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন ফরমান আলী। ওই সময় তার চাকরি চলে গেলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি চাকরি ফিরে পান। এর পরই বেপরোয়া হয়ে পড়েন। সূত্রাপুর থানায় সেকেন্ড অফিসার থাকাকালে ডাকাতি মামলার রিমান্ডের আসামিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এর পর তিনি পদোন্নতি পেয়ে মতিঝিল থানার ওসি হিসেবে যোগ দেন। ওই থানা এলাকায় রিক্রুটিং ও ট্রাভেল এজেন্সির লোকজনকে আটকের নামে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বনানী থানায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি ছিলেন ঢাকার বিমানবন্দর থানায়। সেখানেও স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত আসামিদের থানায় জামাই আদরে রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সর্বশেষ তিনি যোগ দেন বনানী থানায়।

সূত্র: সমকাল

ঢাকারিপোর্টটোয়েন্টিফোর.কম/এইচএমএল


সর্বশেষ সংবাদ